একজন কবি চলে গেলে শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যান না—নীরবে হারিয়ে যায় কিছু শব্দ, কিছু না-বলা অনুভূতি, কিছু অসমাপ্ত কবিতা। আজ সকাল ১০টায় হার্ট অ্যাটাকে কবি মুস্তাফিজুর রহমানের চিরবিদায়ের খবরটি সেই রকমই এক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাহি রাজিউন।
লক্ষ্মীপুরের ১৬ নং শাকচর ইউনিয়ন ছিল তাঁর জন্মভূমি। পেশাগত জীবনে তিনি একজন ব্যাংকার, ব্যক্তিগত জীবনে চিরকুমার; আর আত্মার গভীরে ছিলেন এক নিভৃতচারী, সংবেদনশীল কবি। মফস্বলের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে নিজের নামটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিঃশব্দ সাধনায়—কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রচার নয়, কোনো আত্মপ্রদর্শনের তাড়না নয়; ছিল কেবল কবিতার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।
আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ ও নির্ভেজাল। স্মৃতির ভাঁজে আজও ভেসে ওঠে—লক্ষ্মীপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক নতুন চাঁদ, দৈনিক কালের প্রবাহ, দৈনিক লক্ষ্মীপুর সমাচার, দৈনিক রব পত্রিকা—এই অফিসগুলোতে কাজ করার সময় তিনি যেভাবে নিজের লেখা কবিতা হাতে নিয়ে আসতেন। খুব বেশি কথা বলতেন না। চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের সংযত লাজুকতা। কিন্তু কবিতার কথা উঠলেই তাঁর চোখে জ্বলে উঠত অন্য এক আলো—যেন শব্দই তাঁর প্রকৃত ভাষা।
তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, কিন্তু তাঁর কবিতা ছিল গভীর, সংবেদনশীল ও জীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় ভেজা। সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম—কোনো স্বার্থের মোড়কে বাঁধা নয়। অনেক কবিই আছেন যাঁরা শব্দ দিয়ে নিজেকে বড় করে তোলেন; কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজেকে আড়াল রেখে কবিতাকে সামনে এনেছেন।
আজ তাঁর চলে যাওয়া কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ নয়—এটি এক ধরনের নীরব ক্ষয়। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, বুঝেছেন—তিনি ছিলেন ভেতরে ভেতরে অভিমানী, কিন্তু সেই অভিমান কখনো বিষ হয়ে ওঠেনি; বরং কবিতার পঙ্ক্তিতে রূপ নিয়ে নীরবে ঝরে পড়েছে। সমাজের প্রতি, সময়ের প্রতি, কখনো নিজের প্রতিও—এই অভিমানই তাঁকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছিল।
একজন ভালো মানুষ কেমন হন—মুস্তাফিজুর রহমান তার জীবন্ত উদাহরণ। অহংকারহীন, মার্জিত, বিনয়ী আচরণে তিনি সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শুধু মঞ্চে উচ্চারিত শব্দ নয়, এটি মানুষের চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়।
আজ তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। একই সঙ্গে নিজের ভেতর এক দায়বদ্ধতার কথাও মনে পড়ে—এই ধরনের গুণী মানুষদের জীবদ্দশায় আমরা কতটা মূল্যায়ন করতে পারি? হয়তো খুব কমই। তবু লেখালেখির মানুষ হিসেবে, সাহিত্যের কাছে দায়বদ্ধ একজন মানুষ হিসেবে এটুকু বলা যায়—
মুস্তাফিজুর রহমান চলে গেলেও তাঁর নীরব কবিতারা আমাদের বিবেকের কোথাও না কোথাও থেকে যাবে।
নিভৃত কাব্যের মানুষটি নীরবে চলে গেলেন—কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা অনেক দিন কথা বলবে।




-20260125050728.jpg)




-20260121194743.jpg)




-20260117175219.jpg)
-20260117175020.jpg)






-20260121194743.jpg)




-20260125050728.jpg)
আপনার মতামত লিখুন :