ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কিত হয়ে নিচে নামতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। শুরুতে পুলিশ ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানালেও পরে বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, স্বাভাবিক কারণে তাদের মধ্যে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে কেউ মারা যাননি বলেও দাবি করেছেন তিনি।
নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের বেশিরভাগ সিঁড়িপথ কেন বন্ধ ছিল, কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে ঘটনার কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় আগুন লাগে। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন রোগী ও স্বজনরা। অভিযোগ উঠেছে, ওই ভবনের চারটি সিঁড়ির মধ্যে মাত্র একটি খোলা ছিল। ফলে তাড়াহুড়ো করে নিচে নামতে গিয়ে কয়েকজন হতাহত হন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চিৎকার করে সবাইকে সতর্ক করেন। পরে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজতে থাকে। নিচে নেমে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও একটি গেট বন্ধ থাকায় তারা সেখান দিয়ে বের হতে পারেননি।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শুরুতেই গেট খুলে দেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। তবে পরে মানুষজন বের হতে শুরু করলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ধাক্কাধাক্কি ও ঠেলাঠেলির সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, লিফট কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে যুক্ত বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের রেজিস্টার থেকে কুলসুমা নামে এক নারীর তথ্য পাওয়া যায়। পরে তার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার সময় হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। তিনি তারাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা।
একইভাবে ফুলবাড়িয়া উপজেলার শাহজাহান নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবরও তার ছেলে নিশ্চিত করেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভবনের ভেতরে ছিলেন।
কুলসুমার আত্মীয় ফয়সাল আহমেদ জানান, আগুন লাগার পর ছেলে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বের করে আনার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে সিঁড়িতে পড়ে যান কুলসুমা। ওই সময় মানুষের পায়ের নিচে চাপা পড়ে তার মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন তিনি।
শাহজাহানের ছেলে পলাশ জানান, আগুন লাগার সময় তার বাবা, মা ও এক আত্মীয় তাকে নামিয়ে আনতে গিয়েছিলেন। এ সময় পেছন থেকে মানুষের ধাক্কায় তারা ছিটকে পড়ে যান। পরে অন্যরা তাদের উদ্ধার করে আলাদা কক্ষে নিয়ে যান। এরপর তিনি জানতে পারেন, তার বাবা মারা গেছেন।
তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবীর জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর সঠিক নয়। প্রকৃত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে আসা প্রাণহানির তালিকাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। তালিকায় থাকা একজনকে জীবিত পাওয়া গেছে। বাকি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের তথ্য যাচাই করে দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যরাও জানিয়েছেন, তারা স্বাভাবিকভাবে মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
বাকি দুইজনের মৃত্যুর কারণ এখনও স্পষ্ট নয় জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, চিকিৎসকরাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তারা কী কারণে মারা গেছেন। তাই পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর যে তথ্য প্রচার হয়েছে, তা সঠিক নয়।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের বেশিরভাগ সিঁড়ি কেন তালাবদ্ধ ছিল, সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল কি না কিংবা এ ঘটনায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।
ঘটনার কারণ, অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি এবং হতাহতের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।



































আপনার মতামত লিখুন :