ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
দেশজুড়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও ভুয়া ডাক্তারদের

দৌরাত্ম্য, নেই তদারকি

ভোরের মালঞ্চ | অনলাইন ড্রেস্ক সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১১:৫৬ এএম দৌরাত্ম্য, নেই তদারকি

সারাদেশে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদারকি এবং আদালতের রায়, সবকিছুকে পাশ কাটিয়েই চলছে এসব অনিয়ম। তবে বিএমডিসি ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের দাবি, লোকবল ঘাটতির কারণে ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

 

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অভিযোগ, আইন ও সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করছে না তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা থাকলে ফৌজদারি অপরাধ করা এসব ভুয়া চিকিৎসকদের শেকড় সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব।

 

 

যমুনা টেলিভিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসক কোনো ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বিএমডিসির সনদ ছাড়াই দিনের পর দিন চিকিৎসার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন।

 

 

 

 

 

চিকিৎসা সেবা দিতে প্রয়োজন নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বিএমডিসির নিবন্ধন। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম মানছেন না অনেকেই। অনুসন্ধানে এমন কথিত চিকিৎসকেরও সন্ধান মিলেছে, যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

 

এক কথিত ভুয়া চিকিৎসক নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বলেন, তিনি মানবিকে পড়াশোনা করেছেন। তবে এসএসসির পর ডিপ্লোমা করার কারণে তার পড়াশোনা ‘সায়েন্স’ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন।

 

আরেক কথিত চিকিৎসক নিজেকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ অব কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের একটি রায়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করে সুবিধা নিচ্ছেন এসব প্রতারক। নিয়মের বাইরে গিয়ে কেউ চিকিৎসা দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন বলেন, যেসব ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট রিটটি আসলে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসকের পরিচয়ে সেবা দেওয়া গুরুতর অপরাধ বলেও জানান তিনি।

 

আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএমডিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংস্থাটির গাফিলতিও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। নিষিদ্ধ থাকার পরও কেউ যদি এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যায়, তার জন্য শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।

 

তবে ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা জানান, অভিযান চালাতে গেলে অনেক সময় অভিযুক্তরা আদালতের রায়ের কথা তুলে ধরেন। আর বিএমডিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন বলেন, ১৯৮৩ সালে যে সংখ্যক জনবল নিয়ে কাউন্সিলের কার্যক্রম চলত, এখনও প্রায় একই সংখ্যক স্টাফ দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। নতুন আইন পাস হলে বিএমডিসি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও নৈতিক অবস্থান থেকে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও জরিমানা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

 

অন্যদিকে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া অভিযোগ করেন, আদালতকে ভুল তথ্য ও ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বিভ্রান্ত করে কিছু আদেশ নেওয়া হয়েছে। বিএমডিসি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় চাইলে আদালতের সামনে পুরো বিষয়টি তুলে ধরে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

 

দেশের স্বাস্থ্য খাতে আরেকটি বড় সংকট হলো এমবিবিএস চিকিৎসক ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (MATS) ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ। যোগ্যতা অনুযায়ী ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদেরও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি বিকল্প ধারার চিকিৎসা পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হলেও এসব চিকিৎসকদেরও মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়নি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংকট নিরসন করা গেলে বৈধ চিকিৎসক, বিকল্প ধারার চিকিৎসক এবং ভুয়া চিকিৎসকদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সহজ হবে।

 

ডা. লিয়াকত হোসেন বলেন, সরকার চাইলে বিকল্প ধারার চিকিৎসকদের জন্য আলাদা কাউন্সিল গঠন করে তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

 

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, যেসব ডিগ্রি স্বীকৃতির যোগ্য বা যেসব কারিকুলামে প্রয়োজনীয় বিষয় থাকার কথা, বিএমডিসি সেগুলো অনুমোদন করতে পারে। অন্তত যাচাই-বাছাই করে কোনটি নির্ধারিত মান পূরণ করে আর কোনটি করে না, সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তা না হওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

 

অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক মনে করেন, বিএমডিসিকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুয়া চিকিৎসা ও প্রতারণা বন্ধে বিদ্যমান আইনকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নিতে হবে। ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য বন্ধে বিএমডিসিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামোগত পরিবর্তনও জরুরি।

 

অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা না করলে সংকট থেকেই যাবে।

Side banner