রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা এবং দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান দখলবাজি ও সহিংসতার ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সরকার আসলে কী ভাবছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা কীভাবে মূল্যায়ন করছে?
১. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে ইতিমধ্যে পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নামানো হয়েছে। সরকারের মতে, বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ, বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গতিশীল করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পুলিশ সপ্তাহেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসর বা সহযোগীরা লুকিয়ে থেকে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
২. জননিরাপত্তার সংকট বনাম ‘রেড লাইন’ প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটারের স্টুডিওতে হামলা নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এগুলো জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ‘রেড লাইন’ বা সতর্কবার্তা। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে একটি সরকারি অংশীদারত্বমূলক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দিনের আলোতে বা মধ্যরাতে দখল বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রে আস্থার সংকট তৈরি হয়। সরকার এসব ঘটনাকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তার ওপর নির্ভর করছে জনগণের নিরাপত্তা বোধের বিষয়টি।
৩. পুলিশের ভূমিকা ও দ্বৈত আচরণের অভিযোগ
সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকলেও অন্যদিকে জাসদ কার্যালয়ের সামনে বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে পুলিশকে অত্যন্ত তৎপর ও রাজনৈতিক নির্দেশনানির্ভর ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। সমালোচকদের মতে, পুলিশ এখনো পুরোপুরি পেশাদার ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কাজ করার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা ও প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ।
৪. সরকারের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সদিচ্ছার পরীক্ষা
মিরপুরের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের (ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি) বিরুদ্ধে জড়িত থাকার শক্ত অভিযোগ ওঠায় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি বা নিত্যপণ্যের দামের চেয়েও সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের বাড়ি, জমি, ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকার এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপচেষ্টা হিসেবে দেখলেও, নাগরিক সমাজের মতে, এগুলো রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় ব্যর্থতার লক্ষণ। মিরপুর কিংবা অন্যান্য দখলবাজির ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই সরকার প্রমাণ করতে পারে যে তারা জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে কি না।








































আপনার মতামত লিখুন :