প্রবেশ ও আতঙ্ক সৃষ্টি: শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সশস্ত্র হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে নিউগিনি প্রপার্টিজের মূল ফটকের সামনে জড়ো হয়। এরপর ফটক ভেঙে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা হাউজিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করে।
নির্মাণশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন: স্টুডিওর পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে কাজ শেষে অবস্থানরত শ্রমিকেরা গুলির শব্দ শুনে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা ছাদে গিয়ে তাঁদের নিচে নামিয়ে আনে। পরে তাঁদের মারধর করে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।
লুটপাট ও ভাঙচুর: হামলাকারীরা প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে লুটপাট চালায় এবং মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এরপর নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিস ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের টিনশেড স্টুডিওর শাটারগেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। স্টুডিওর কাচের টুকরা, ভাঙা সোফা, বাদ্যযন্ত্র, চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও শুটিংয়ের মূল্যবান উপকরণ তছনছ করা হয়।
পুলিশের ওপর হামলা ও পিছু হটা: ঘটনার সময় স্থানীয়দের খবরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও গুলির শব্দ শোনা যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তবে হামলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় পুলিশ একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
স্থানীয় সূত্র ও নিউগিনি প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে পাশের জমির মালিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছে। প্রপার্টিজের পরিচালক ও মামলার বাদী মো অভিযোগ করেন, মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর জমিতে যাতায়াতের রাস্তা তৈরির জন্য জোরপূর্বক এই ফটক ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামিরা হলেন:
শাহরিয়া মাহমুদ (৬০)
আবুল কাশেম (৫৩)
বাবুল হোসেন (৪৯)
মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী (৬৭)
মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান (৪৭)
মতিউর রহমান (৪৮)
মজিবুর রহমান (৪৭)
নুরুল ইসলাম (৫১)
মিজানুর রহমান (১৯)
এম কে আজাদ (৫৪)
মো. মামুন (৩২)
মো. আসলাম (২৪)
মো. মুন্না (২৯)
এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা শটগান, রিভলবার, চাপাতি ও রামদা নিয়ে হামলা চালায় এবং প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে ২৫ লাখ টাকা চুরি ও লাখ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিসাধন করে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং পুলিশ অভিযান চালিয়ে মো. মামুন, আসলাম, মুন্না ও অনিকসহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
হামলার পরপরই কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে তাঁর স্টুডিওর ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম দেখা যায়। তিনি জানান, স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের বহু গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ ও শুটিংয়ের উপকরণ ছিল, যা হারিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা। তবে যতই বাধা আসুক, তাঁরা কাজ বন্ধ করবেন না বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রাথমিক তদন্তে এটি ৩৫ কাঠার একটি বিতর্কিত জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জের বলে প্রতীয়মান হয়েছে এবং এই ঘটনায় সালমান মুক্তাদির সম্পূর্ণ ভিকটিমাইজড হয়েছেন। তবে সালমান মুক্তাদিরের লাইভে বিএনপির বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগকে একটি ‘ঢালাও মন্তব্য’ বলে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা করলে তা তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিকেলে আরেকটি ভিডিও বার্তায় সালমান মুক্তাদির প্রশ্ন তোলেন যে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগে এবং মন্ত্রীর বক্তব্য আসার আগপর্যন্ত ভুক্তভোগীরা কেন থানায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও মামলা করতে পারেননি। তিনি স্পষ্ট করেন যে তাঁর কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন নেই, তবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।








































আপনার মতামত লিখুন :