জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি পাড়ি জমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এসব মানুষের অনেকেই আর জীবিত হয়ে ফিরতে পারেন না। বিদেশের মাটিতে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। দেশে ফিরছে একের পর এক মরদেহ।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ হাজার ৩৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ দেশে এসেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪২০ জন এবং প্রতিদিন প্রায় ১৪ জনের মরদেহ দেশে ফিরেছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে আরও ৮৮১ জনের মরদেহ দেশে এসেছে।
তবে এই সংখ্যা প্রবাসে মারা যাওয়া সব বাংলাদেশির পূর্ণ সংখ্যা নয়। কারণ অনেক পরিবারের সিদ্ধান্তে মরদেহ বিদেশেই দাফন করা হয়। ফলে দেশে আসা মরদেহের সরকারি হিসাব দিয়ে মোট মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুন, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া, হত্যা ও অন্যান্য কারণে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রাণ হারাচ্ছেন।
একটি দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে আসা ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জন সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বৈদ্যুতিক শকে মারা গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৪৯ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে। ওমরাহ শেষে জেদ্দা থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় এক প্রবাসী বাংলাদেশির পরিবারের চার সদস্যসহ পাঁচ বাংলাদেশি নিহত হন। নিহতদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায়। এ ঘটনায় প্রবাসীর আরেক মেয়ে গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনায় একটি পরিবারের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। স্বজনদের জন্য ওমরাহর পর প্রিয়জনের দেশে ফেরার অপেক্ষা পরিণত হয় একসঙ্গে একাধিক মরদেহ গ্রহণের নির্মম বাস্তবতায়।
২০২৬ সালের জুনে কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হন। নিহতরা সবাই সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। তারা একটি পিকআপ ভ্যানে করে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। কাতারের শাহানিয়া এলাকায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারালে দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন, যাদের পাঁচজনই ছিলেন বাংলাদেশি।
একসঙ্গে পাঁচজন কর্মজীবী মানুষের মৃত্যুতে তাদের পরিবারগুলোতে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে স্বজনরা।
২০২৬ সালের মে মাসে ওমানে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। দেশটির একটি গাড়ি থেকে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তারা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে দুজনের দেশে ফেরার প্রস্তুতিও চলছিল।
প্রাথমিকভাবে গাড়ির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহ করা হলেও পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের বিষয়টি সামনে আসে। চার ভাইয়ের মরদেহ পাশাপাশি দাফনের প্রস্তুতি নেয় পরিবার।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের ৩৪ তলা থেকে পড়ে এক বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিক নিহত হন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে আসে এই ঘটনায়।
প্রবাসীদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নিয়ে বাংলাদেশে আলাদা করে তদন্ত হয় নাএমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একটি গবেষণায় ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫৫৪ জন মৃত প্রবাসীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৭ বছর। মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা কারণ নিয়েও অনেক পরিবারের সন্দেহ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ, প্রচণ্ড গরম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড গরমে নির্মাণসহ বিভিন্ন শ্রমঘন কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মীদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
একজন প্রবাসী যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তখন তার সঙ্গে শুধু একটি ব্যাগ যায় না যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন। কেউ বাড়ি করার স্বপ্ন দেখেন, কেউ সন্তানের পড়াশোনা, কেউবা পরিবারের ঋণ পরিশোধের আশায় বিদেশে যান।
কিন্তু সেই মানুষটিই যখন কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরেন, তখন শুধু একজন মানুষকে হারায় না একটি পরিবার; হারিয়ে যায় পরিবারের প্রধান উপার্জনের উৎসও।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ হাজার ৩১২ জন প্রবাসীর পরিবারের মধ্যে মোট ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মরদেহ দেশে এলে পরিবহন ও দাফন খরচ হিসেবে ৩৫ হাজার টাকা সহায়তাও দেওয়া হয়।

















-20260828115158.jpg)






















আপনার মতামত লিখুন :