ঢাকা শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

নেপালের বন্যার পানি গঙ্গায়, সতর্ক বাংলাদেশ

ভোরের মালঞ্চ | অনলাইন ডেস্ক আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১১:০৫ এএম নেপালের বন্যার পানি গঙ্গায়, সতর্ক বাংলাদেশ

নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ৫৭৯ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ প্রায় দুই হাজার।

 

হিমবাহ ধস ও নদীর প্রবাহ আটকে সৃষ্ট এই পাহাড়ি ঢল ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী হয়ে নেমে যাচ্ছে ভারতের গঙ্গা অববাহিকায়। সেখান থেকে গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশেও আসতে পারে। 

 

তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়ায় নেপালের এ বন্যার পানি সরাসরি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি না থাকলেও উজানের বৃষ্টি ও নদীর পানি বাড়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।

 

এক প্রতিবেদনে ডেইলিস্টার জানায়, ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক এ বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে কাদা, পাথর ও বিপুল পানি প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। ত্রিশূলী নদীর একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।

 

এ ঢল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে নারায়ণী নদী অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ভেসে গেছে সেতু, সড়ক, বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো। নদীর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রও অনেক জায়গায় সংকেত পাঠানোর আগে ধ্বংস হয়ে যায়।

 

ভূ-তত্ত্ববিদরা বলছেন, এ ধরনের আকস্মিক বন্যাকে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা গ্লফ বলা হয়। হিমবাহ ধস, বরফ-পাথরে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়া এবং পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল জলরাশি নেমে আসার ফলে অল্প সময়ে ভয়াবহ বন্যা তৈরি হয়।

 

রাসুয়ার এবারের বন্যাতেও এমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

নেপালের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি ভৌগোলিক ও পানিপ্রবাহগত সংযোগ রয়েছে। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী হয়ে পানি নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় পড়বে। পরে গণ্ডক ভারতের বিহার দিয়ে গঙ্গায় মিশবে। গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে সেই পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।

 

তবে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন বলেন, নেপাল থেকে নেমে আসা পানি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময় এর তীব্রতা অনেকটা কমে যাওয়ার কথা।

 

তিনি বলেন, নেপালের সংশ্লিষ্ট এলাকায় একাধিক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এসব হ্রদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বাংলাদেশকে ভারতের বন্যা ও নদীর পানির স্তরের তথ্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

 

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেনও সরাসরি বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না। তাঁর মতে, উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানির গতি অনেক কমে যাবে। তবে আগামী কয়েক দিনে উজানে ভারি বৃষ্টিপাত হলে দ্বিতীয় দফার বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

 

এ কারণে ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের গঙ্গা অববাহিকার বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানির তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ, তিস্তা ব্যারাজসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির স্তরও নজরদারিতে রাখার কথা বলেছেন এই গবেষক।

 

আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির এক যৌথ গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলের তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি বাড়ায় এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবেলায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা জরুরি।

 

বাংলাদেশের জন্য এবারের বন্যায় তাৎক্ষণিক বড় বিপদের আশঙ্কা কম হলেও ঘটনাটি হিমালয়-নির্ভর নদী অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। তাই বন্যার পানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই উজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভুল ও দ্রুত তথ্য পাওয়াকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Side banner