ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
আর্জেন্টিনার জার্সিকে মেসির বিদায়, শিরদাঁড়া হিমশীতল করা

সেই ঘোষণা

ভোরের মালঞ্চ | অনলাইন ড্রেস্ক সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১১:০৬ এএম সেই ঘোষণা

রোজারিওর অন্ধগলিতে আলোর ফেরিওয়ালা সেই পুচকে ছেলেটা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় বলেছে? সত্যিই বিদায় বলেছে? হঠাৎ শিরদাঁড়া হিমশীতল করে দেয় এমন এক অবসরের ঘোষণা, সত্যিই কী লিওনেল মেসি দিয়েছেন?

 

অবিশ্বাস্য হলেও চোখে জল আনা এমন একদিন তো আমাদের জীবনে আসতোই। এরপরও বুকটা কেমন জানি ধরফর করে ওঠে। এমন দিন কী সত্যিই আসবে, আসা কী উচিত? তিনি বিদায় নেবেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে, ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তবে তিনি ফুটবলের ঈশ্বর বটে, কিন্তু মানুষও তো। একদিন তো পাটাতারি গোটাতেই হতো। সেই ঘোষণাই এলো আজ, জাতীয় দল থেকে অবসর—সবকিছু অবস করে দেওয়া, মন কেমন করে দেওয়া নিষ্ঠুর এক বার্তা।

 

নোবেলজয়ী সংগীতশিল্পী বব ডিলান তার গানে কবিতার ছন্দে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কতটা পথ হাঁটলে, পথিক হওয়া যায়?’ ১৯৬৩ সালে লেখা সেই গানের উত্তর ফুটবলের সঙ্গে মিলিয়ে অবশ্য দেওয়া যায়। জবাব দিয়েছিল পেলের দেশের পত্রিকা ‘গ্লোবো’।

 

দীর্ঘ অপেক্ষার পর লিওনেল মেসির ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ে ব্রাজিলের পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, ‘ফুটবল তার দায় শোধ করলো।’ কেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের পত্রিকাটি মেসিকে সম্মান জানিয়ে এমন শিরোনাম করেছিল? যে দেশ ফুটবল খায়, ফুটবলে ঘুমায়, তারা আসলে জানে লিটল জিনিয়াস ফুটবলকে কী দিয়েছে, ফুটবল তার কাছ থেকে কী পেয়েছে। আসলেই, এমন পথিক ছাড়া ফুটবলই তো পথ হারায়, দিকচিহ্নহীন হয়ে যায়, এটা জানা আছে সেলেসাওদের। এজন্যই এ কালের ফুটবল ঈশ্বর মেসিকে নিয়ে গ্রেট পেলে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ মেসির প্রাপ্য ছিল।’

 

ব্রহ্মাণ্ডে শত-হাজার ফুটবলার থাকতে কেন মেসিরই বিশ্বকাপ প্রাপ্য ছিল? এর উত্তর কী এরকম হতে পারে—বার্সেলোনাকে দল হিসেবে কয়েক বছর আগে বলা হতো, ‘বার্সেলোনা, মোর দ্যান আ ক্লাব’। দল হিসেবে বার্সেলোনার এই সম্মানের বড় ভাগীদার ছিল খোদ মেসি। কারণ সে শুধু ফুটবলার নয়, মোর দ্যান আ ফুটবলার।

 

কে যেন বলেছিল? কারও যদি মন খারাপ থাকে, ক্লান্তি কিংবা চাপ বোধ হয়, তখন মেসির খেলার বিশেষ মুহূর্তগুলো দেখেন। এতে নাকি মহৌষধ আছে। মন ভালো হয়ে যায়। আমি এই দাওয়াই খেয়ে দেখেছি। আসলেই এই ওষুধ কার্যকর, যারা ফুটবল বোঝেন ও ভালোবাসেন তাদের জন্য। যারা কম বোঝেন, মজার জন্য দেখেন তাদের জন্যও মেসির ঐশ্বরিক ফুটবল দক্ষতা সঞ্জীবনী।

 

ফুটবল গতি, দম ও কৌশলের খেলা। মেসি সেই অভিধানে যোগ করেছেন সৌন্দর্য ও মস্তিষ্ক। এক মুহূর্তেরও কম সময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সতীর্থকে পাস দেবেন, ড্রিবলিং করে এগিয়ে যাবেন নাকি গোলে শট নেবেন। এই জায়গায় তিনি ভিন্ন গ্রহের, এ জন্যই তিনি জাদুকর।

 

ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব আটবার জিতে রেকর্ড করেছেন। কোপা আমেরিকা, লা ফিনালিসিমা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অলিম্পিকে স্বর্ণ, ক্লাব বিশ্বকাপ, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ—কী জেতেননি? অধরা বিশ্বকাপও জিতেছেন ২০২২ সালে। এর আগে ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জিততে জিততে হেরেছেন। আর ২০২৬ সালে বয়সের ভারে নুব্জ্য একটি দলকে ফাইনালে তুলেছেন নিজের একক ক্যারিশমায়। ৩৯ বছর বয়সেও খেলছেন, শুধু খেলেননি, জীবনের শেষ বিশ্বকাপে গোল করেছেন ৮টি। করিয়েছেন আরও ৩টি। রেকর্ড ছয় বিশ্বকাপ খেলে লিওনেল মেসির গোল ২১টি এবং সহায়তা ১২টি। আর জাতীয় দল আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি, গোল বানিয়েছেন ৬৮টি।

 

তবে মেসির ক্ষেত্রে এসব পরিসংখ্যান কিছু নয়। মাঠে তার প্রভাব কোনো পাল্লাতেই পরিমাপযোগ্য নয়। তার মাতৃভূমির শত্রু দেশ ইংল্যান্ডের দৈনিক মিররের ভাষায়, মেসি হলেন গোট (সর্বকালের সেরা)। ডেইলি টেলিগ্রাফের কাছেও তিনি সর্বকালের সেরা। এর কারণ তিনি পায়ে বলটা নাচালেও আসলে খেলেন মস্তিষ্ক দিয়ে। গতির ঝড়ের চেয়ে তার অলস আর ভয়ংকর মুভই যে পাল্টে দেয় খেলার গতিপথ। এর উদাহরণ তো ২০২৬ বিশ্বকাপেই আরও একবার দেখেছে ফুটবল বিশ্ব।

 

জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার মানুষকে একটা বিশেষ সত্তা হিসেবে দেখতেন। এর নাম দিয়েছেন ‘ডা-জাইন’, জার্মান এই শব্দের অর্থ ‘এইখানে থাকা’। হাইডেগারের কাছে, মানুষ কেবল একটা বস্তু নয়। মানুষ তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন। মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, ‘কেন আমি আছি?’, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী?’। অন্যান্য বস্তু যেমন, একটা পাথর বা একটা গাছ, তাদের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তারা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা কেবল ‘আছে’। মেসি সেখানেই অনন্য, বিরল। ফুটবলে অনেক কিংবদন্তি ‘আছেন’, কিন্তু লিওনেল মেসি শুধু সেরকমভাবে আছেন, এমন নয়। তিনি হৃদয়বিদীর্ণ করে আছেন, থাকবেন, যতদিন ফুটবল আছে।

Side banner