দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মহড়ার বিপুল ব্যয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন কর্মকাণ্ডে সিউলের অংশ না নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে রোববার (১৬ আগস্ট) পেন্টাগনকে এ নির্দেশ দেন তিনি।
মহড়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে, ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র এতে অংশ নিতে সম্মত হওয়ায় তিনি ‘খুশি নন’। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, এসব যৌথ সামরিক মহড়া শুধু ব্যয়বহুলই নয়, বরং উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও বৈরী’ বার্তাও পাঠায়। তার দাবি, তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো হুমকি দেখায়নি এবং সম্মানজনক আচরণ করেছে।
বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ রয়টার্সকে জানিয়েছে, ট্রাম্পের নির্দেশের পরও সোমবার (১৭ আগস্ট) নির্ধারিত সময়েই মহড়া শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ব্লু হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্য তারা পর্যালোচনা করছে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার নেতাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় অর্থবহ সংলাপের পথ খুলে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সিউল।
ব্লু হাউস আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক মহড়ার বিষয়ে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে।
ইরান ইস্যুতে সিউলের অবস্থান
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার মার্কিন প্রচেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন—ট্রাম্পের এমন দাবিরও জবাব দিয়েছে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোরীয় উপদ্বীপে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়াও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তবে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ বা কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নতুন নয়। এর আগে, সিউলের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার ব্যয় ভাগাভাগি এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তায় তাদের ভূমিকা নিয়ে বিরোধের সময়ও মহড়া কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়ে আসছে।
সম্প্রতি, উত্তর কোরিয়া, জাপান সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর কয়েক দিন আগেও দেশটি একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে আকস্মিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পিয়ংইয়ংয়ে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ট্রাম্প ও কিম জং উনের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় কিমকে ‘লিটল রকেট ম্যান’ বলে উপহাস করে উত্তর কোরিয়াকে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে অবশ্য দুই নেতা তিন দফা বৈঠকে বসেন। এমনকি কিমকে চিঠি বিনিময়ের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তাদের মধ্যে ‘ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল’।
তবে এসব বৈঠক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কোনোটিই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
যৌথ সামরিক মহড়া কীভাবে কমানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি গোলাবর্ষণ ও যুদ্ধাভ্যাসের পরিবর্তে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার হামলার মতো পরিস্থিতির অনুশীলন বাড়িয়েছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কোরিয়া কর্মসূচির প্রধান ভিক্টর চা মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য থাকতে পারে ট্রাম্পের।
তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক সহায়তার প্রেক্ষাপটেও ট্রাম্প কিমের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চাইতে পারেন। এর মাধ্যমে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলার চেষ্টা হতে পারে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া উত্তর কোরিয়ার সেনারা ওই সংঘাত থেকে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইউক্রেনও সম্প্রতি দাবি করেছে, রাশিয়ার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উত্তর কোরিয়ায় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন নর্দার্ন কমান্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জোসেফ জারার্ড গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর কোরিয়া এমন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে পরীক্ষা করেছে, যেগুলোর পর্যাপ্ত শক্তি রয়েছে উত্তর আমেরিকার যেকোনো স্থানে পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে আঘাত হানার।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা ভাগাভাগি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দক্ষিণ কোরিয়া।
তবে দুই দেশের সম্পর্কে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে কাজ করা এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, অর্থনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান সরকারের ‘অনমনীয় অবস্থানে’ ট্রাম্প হতাশ।
গত বছর দুই দেশ একটি বাণিজ্য চুক্তি করে। এর আওতায় ট্রাম্পের গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এখন পর্যন্ত ওই বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি সিউল।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কুপাংকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ গ্রাহক তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে।













-20260815093723.jpg)

























-20260814143056.jpg)
আপনার মতামত লিখুন :